শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

গুমের আলামত কাদের স্বার্থে ধ্বংস করা হচ্ছে?

গত মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের কার্যালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। এ সংবাদ সম্মেলনের খবর দৈনিক সংগ্রামসহ অধিকাংশ জাতীয় দৈনিকে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে গুম কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এবং অন্যান্য সদস্য ও সদস্যাগণ বক্তব্য রাখেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এ পর্যন্ত তারা যেসব তথ্য পেয়েছেন তাতে বোঝা যাচ্ছে যে, ডিজিএফআই এর কথিত আয়নাঘরের তুলনায় র‌্যাবের গোপন বন্দীশালা আরো বেশি ভয়ংকর ও অমানবিক ছিল।

তারা জানান, র‌্যাব পরিচালিত বন্দীশালার সেলগুলো ছিল মাত্র à§© দশমিক à§« বাই ৪ ফুট। সেখানে আলো ঢোকার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। একটি ড্রেন ছাড়া সেখানে কোনো স্যানিটেশন ব্যবস্থাও ছিল না। এমন পরিবেশেই বন্দীদের বছরের পর বছর আটকে রাখা হতো। কমিশন এ পর্যন্ত গুমের ৪০০টি অভিযোগ যাচাই-বাছাই করেছে, যার মধ্যে ১৭২টি ঘটনায় র‌্যাব, ৩৭টি ঘটনায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি), ২৬টি ঘটনায় ডিরেক্টরেট জেনারেল ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই), ৫৫টি ঘটনায় গোয়েন্দা শাখা, ২৫টি ঘটনায় পুলিশ ও ৬৮টি ঘটনায় অন্যদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সদস্য নূর খান বলেন, ‘একটা মানুষ গুম থাকা অবস্থায় কীভাবে রোজনামচা লেখে বা তার সংকেত লিখে যায়, কীভাবে দিন গণনা করে, এর প্রমাণ আমরা পেয়েছি। এর বাইরেও কারও কারও নাম আমরা পেয়ে গেছি। আমরা শুনেছি, আয়নাঘর, যেটা দ্বারা আমরা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারকে বুঝতাম, এর চেয়েও নিকৃষ্টতম সেল আমাদের কাছাকাছি জায়গাতেই ছিল। আমরা সেগুলো পরিদর্শন করেছি।’

কমিশনের আরেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো প্রমাণ নষ্ট করছে। তারা সেল ও দেয়াল ভেঙে ফেলছে। যেসব বাহিনী প্রমাণ নষ্ট করছে তারা আমাদের সহযোগিতা করছে না। এখনকার কর্মকর্তারাও আগের কর্মকর্তাদের অপরাধে জড়িত ছিলেন।” নাবিলার এই কথাগুলো আমাদের জন্য ভীষণ পীড়াদায়ক ও উদ্বেগজনক। ছাত্রজনতার আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার à§© মাস সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এখনও প্রশাসনে, আইন শৃংখলা বাহিনীতে এমন সব লোক রয়ে গেছে যারা আগের কর্মকর্তাদের অপরাধে যুক্ত ছিলেন। তার মন্তব্যে এও স্পষ্ট যে, এসব স্পর্শকাতর জায়গায় এমন সব ব্যক্তি কর্মরত রয়েছে, যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের অমানবিক ও মানবতা বিরোধী অপরাধের আলামতগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

আয়নাঘর বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি কলংকজনক অধ্যায়। রাজনৈতিক একটি সরকার এভাবে নিজ দেশের জনগণকে গুম করে গায়েব করে ফেলতে পারে, তাদের আটকের কথা দিব্যি অস্বীকার করে বছরের পর বছর তাদেরকে জীবন্মৃত করে রাখতে পারে-এ ধরনের ঘটনা বিশ^ ইতিহাসে নজিরবিহীন। হাসিনা সরকারের এসব কর্মকান্ড গোটা বিশে^র সামনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণœ করেছে।

এ বাস্তবতায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আয়নাঘর এবং যাবতীয় গুমের ঘটনাগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করা এবং প্রকৃত অপরাধীদের জাতির সামনে নিয়ে আসা। অন্যথায় এ কলংকের দায় থেকে আমরা মুক্তি পাবো না। পাশাপাশি, গুম কমিশনের সদস্যদের অভিযোগ সম্বন্ধেও সরকারের তড়িৎ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। প্রশাসন ও আইন শৃংখলা বাহিনীর ভেতর ঘাপটি মেরে থেকে যেসব কর্মকর্তা গুমের আলামত নষ্ট করছেন তাদেরকে অবিলম্বে শনাক্ত করে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা কিংবা অনতিবিলম্বে স্পর্শকাতর এসব প্রতিষ্ঠান থেকে তাদেরকে অন্যত্র বদলি করা এখন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ